ইতিহাস · ঐতিহ্য

নকশী কাঁথার ইতিহাস ও উৎপত্তি — বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী শিল্প

একটা মা তার মেয়ের বিয়ের আগে পুরোনো শাড়ি ভেঙে কাঁথা বানাতেন। প্রতিটি ফোঁড়ে গল্প ছিল — জন্মের, বিয়ের, ফসলের, কষ্টের। সেই কাঁথাই একদিন জসীমউদ্দীনের কলমে জাতীয় সাহিত্যে ঢুকে গেল। আর আজ সেই কাঁথা লন্ডনের নিলামঘরে $৬০০-এ বিক্রি হচ্ছে।

প্রকাশিত: ৩ জুন, ২০২৬৭ মিনিট পড়ার সময়

উৎপত্তি — কখন, কোথায় শুরু হয়েছিল?

নকশী কাঁথার সঠিক জন্মতারিখ কেউ জানে না। এটা কোনো রাজদরবারের শিল্প ছিল না — গ্রামের নারীরা পুরোনো শাড়ি, ধুতি, লুঙ্গি ভেঁজে কাঁথা বানাতেন নিজের সংসারের জন্য। সেই কাঁথায় ফোঁড়ে ফোঁড়ে নকশা তুলতেন। ঐতিহাসিকরা মনে করেন এই ঐতিহ্য অন্তত পাঁচশো বছরের পুরোনো।

দুটো জেলা আলাদাভাবে বিখ্যাত। ময়মনসিংহ — এখানকার কাঁথায় জ্যামিতিক মোটিফ বেশি, রেখার কাজ সরল কিন্তু শক্তিশালী। যশোর — ফুলেল মোটিফ, বাঁকানো লতা-পাতার কাজ, রঙের ব্যবহার বেশি জীবন্ত। আজও এই দুটো অঞ্চলের কাঁথা দেখলে শৈলীর পার্থক্য বোঝা যায়। রাজশাহীর কাঁথা মিহি সুতা ব্যবহার করে, নকশা সূক্ষ্মতর।

কাঁথা কীভাবে তৈরি হয়?

পুরোনো সুতি কাপড়ের কয়েকটি স্তর একসাথে সেলাই করে কাঁথার ভিত্তি তৈরি হয়। এরপর রঙিন সুতা দিয়ে কাঁথা ফোঁড় — একটি বিশেষ রানিং স্টিচ — ব্যবহার করে নকশা তোলা হয়। ফোঁড়গুলো ঘন করে সাজানো হলে নকশা ভেসে ওঠে, পটভূমি ডুবে যায়।

একটি মাঝারি আকারের নকশী কাঁথা (৬০×৮০ ইঞ্চি) তৈরিতে একজন দক্ষ কারিগরের ৩–৬ সপ্তাহ লাগে। জটিল ডিজাইনের বড় কাঁথা — যেখানে ময়মনসিংহের গীতিকা বা পৌরাণিক দৃশ্য থাকে — সেগুলোয় তিন মাসও চলে যায়।

জসীমউদ্দীন ও সাহিত্যে অমরত্ব

১৯২৯ সালে কবি জসীমউদ্দীন লিখলেন "নকশীকাঁথার মাঠ"। কবিতায় একটি মা তার মেয়ের জন্য কাঁথায় জীবনের গল্প বুনে যাচ্ছেন — যে গল্প লেখায় লেখা হয়নি, শুধু ফোঁড়ে ফোঁড়ে রেখে গেছেন। এই কবিতা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি হিসেবে স্বীকৃত।

কবিতার মূল বক্তব্য: কাঁথা শুধু কাপড় না — এটা স্মৃতির পাত্র। একজন নারী তার পুরো জীবনের অনুভূতি সেই কাঁথায় রেখে যান। এজন্যই পুরোনো নকশী কাঁথা বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে হস্তশিল্পের বাইরে গিয়ে আবেগের বস্তু হয়ে উঠেছে।

প্রকারভেদ — কোনটা কীসের জন্য?

ধরনব্যবহারবিশেষত্ব
লেপ কাঁথাশীতকালীন কম্বলমোটা, উষ্ণতার জন্য
সুজনি কাঁথাঅনুষ্ঠান / উপহারপাতলা, নকশা সূক্ষ্ম
বউ কাঁথাবিয়ের উপহারবরের বা বধূর পরিবার দেয়
আর্শিলতা কাঁথাসংগ্রহ / প্রদর্শনআয়না-সুতার মোটিফ

UNESCO স্বীকৃতি ও জাতীয় তালিকা

নকশী কাঁথা বাংলাদেশের জাতীয় অস্পর্শ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য (ICH) তালিকায় ২০১৩ সাল থেকে নথিভুক্ত।UNESCO-র "Intangible Cultural Heritage of Humanity" তালিকায় অন্তর্ভুক্তির বিবেচনা ২০২১–২২ সালে হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের কাঁথাও একই শিল্পধারার অংশ — তবে ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের ময়মনসিংহ ও যশোরের ঘরানা আলাদাভাবে স্বীকৃত।

এই স্বীকৃতির ব্যবহারিক ফল আছে। বাংলাদেশ ক্রাফট কাউন্সিল, আড়ং, প্রবর্তনা-সহ একাধিক NGO এই স্বীকৃতি ব্যবহার করে গ্রামীণ নারী কারিগরদের সরাসরি বিদেশি ক্রেতার সাথে যুক্ত করছে।

বর্তমান বাজারদর — এবং কেন এটা অবমূল্যায়িত

বাংলাদেশে নকশী কাঁথার দাম:

  • · নিত্যব্যবহারের কাঁথা: ৳৮০০–২,০০০
  • · উপহারযোগ্য মান: ৳৩,০০০–৮,০০০ (সরাসরি কারিগর থেকে)
  • · সংগ্রাহক মান: ৳১৫,০০০–২৫,০০০ (জটিল নকশা, ৬+ সপ্তাহের কাজ)
  • · মিউজিয়াম গ্রেড: ৳৫০,০০০+ (বিরল থিম, প্রামাণিক শিল্পী)

লন্ডন বা নিউ ইয়র্কে এই একই কাঁথা $২০০–৬০০-এ বিক্রি হচ্ছে। গ্যাপটা বিশাল। বাংলাদেশের ৳৩,০০০–৮,০০০-এ যে কাঁথা পাওয়া যায় — সেটা সরাসরি কারিগর থেকে কিনে বিদেশে পাঠালে ৫–১০ গুণ দামে বিক্রি হতে পারে। এটা নকশী কাঁথার সবচেয়ে কম ব্যবহৃত রপ্তানি সুযোগ।

পুনরুজ্জীবনের কাজ — কারা করছে?

আড়ং ১৯৭৮ সাল থেকে নকশী কাঁথা কারিগরদের সংগঠিত করে বাজারে এনেছে। প্রবর্তনা যশোরের নারী কারিগরদের সাথে সরাসরি কাজ করে, রপ্তানিযোগ্য মান ধরে রাখে। বাংলাদেশ ক্রাফট কাউন্সিল প্রশিক্ষণ দেয়।

তবে অনলাইন চ্যানেলে নকশী কাঁথার উপস্থিতি এখনো দুর্বল। ক্রেতা — বিশেষত প্রবাসী বাংলাদেশি — সহজে যাচাইকৃত কারিগরের কাঁথা খুঁজে পান না। এই ফাঁকটা পূরণ হলে শিল্পীরা সরাসরি উপকৃত হবেন।

কারুবাড়িতে কারিগরের নকশী কাঁথা দেখুন

প্রতিটি কাঁথায় কারিগরের নাম, এলাকা, এবং কাজের সময় উল্লেখ থাকে। ময়মনসিংহ, যশোর এবং রাজশাহীর আলাদা ঘরানার কাঁথা পাওয়া যায়। বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থাও আছে।

নকশী কাঁথা দেখুন →

এই লেখা সম্পর্কে

লেখক: কারুবাড়ি টিম · Founder & Curator। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের তথ্য বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, BRAC আর্কাইভ এবং জসীমউদ্দীনের রচনাবলি থেকে যাচাই করা হয়েছে। দামের তথ্য মে ২০২৬-এর বাজার অনুযায়ী। সংশোধন বা মন্তব্যের জন্য hello@karubari.com-তে লিখুন। নকশী কাঁথার ডিজাইন, মোটিফের অর্থ ও আঞ্চলিক শৈলী নিয়ে আরও পড়ুন নকশী কাঁথার পূর্ণাঙ্গ গাইড