কাঁচামাল · উদ্ভিদবিদ্যা

শীতল পাটি গাছ: মুর্তা কোথায় জন্মে, কীভাবে বেত সংগ্রহ হয়

মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় এক পাটিয়ালের বাড়ির পেছনে প্রায় দেড় বিঘা জমি জুড়ে মুর্তা গাছ। গাছ বলতে যেটা মাথায় আসে সেটা না - বড় ঘাসের মতো, ৩-৪ মিটার লম্বা, জলাভূমিতে গোড়া ডুবে থাকে। আমি প্রথমবার দেখে ভেবেছিলাম বাঁশের ঝাড়। কিন্তু কাছ থেকে দেখলে পার্থক্য পরিষ্কার।

প্রকাশিত: ৩১ মে, ২০২৬৬ মিনিট পড়ার সময়

মুর্তা গাছ আসলে কী?

বৈজ্ঞানিক নাম Schumannianthus dichotomus। Marantaceae পরিবারের সদস্য। বাংলায় বলি মুর্তা, পাটিবেত, শীতলপাটির গাছ। সিলেটিতে অনেকে "মোস্তা" বলেন।

দেখতে অনেকটা বড় আখের মতো - কাণ্ড সোজা, পাতা চওড়া, উচ্চতা ৩ থেকে ৫ মিটার। কিন্তু আখের সাথে এর কোনো আত্মীয়তা নেই। এটা একটা বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ, মানে একবার লাগালে প্রতি বছর নতুন কাণ্ড বের হয়। গোড়া থেকে রাইজোম ছড়িয়ে নতুন চারা তৈরি করে নিজেই। বাঁশের মতো clump তৈরি করে, তবে বাঁশের চেয়ে অনেক পাতলা।

কোথায় জন্মে?

মুর্তা গাছের জন্য দরকার: স্থায়ী আর্দ্রতা, ছায়াযুক্ত পরিবেশ, এবং পলিমাটি। বাংলাদেশে এই তিনটি শর্ত একসাথে মেলে সিলেট বিভাগের হাওর-সংলগ্ন নিচু জমিতে। মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, সিলেট সদর। এই চার জেলাই মুর্তার প্রধান আবাস।

ভারতের আসাম, ত্রিপুরা আর মিজোরামেও কিছু মুর্তা জন্মে। মিয়ানমারেও আছে বলে শুনেছি, তবে সেখানকার মুর্তা দিয়ে শীতল পাটি বোনা হয় কিনা নিশ্চিত না। বাংলাদেশের বাইরে এই গাছের কাণ্ড থেকে মাদুর বোনার ঐতিহ্য প্রায় নেই বললেই চলে।

একটা কথা পরিষ্কার করা দরকার। সিলেট ছাড়া বাংলাদেশের অন্য জেলায়ও মুর্তা জন্মে, তবে সেটা খুব কম পরিমাণে এবং কাণ্ডের গুণগত মান একই হয় না। কুলাউড়া ও শ্রীমঙ্গলের পাটিয়ালরা বলেন, হাওরের পানির লেভেল এবং মাটির বিশেষ পলি - এই দুটো মিলে মুর্তার কাণ্ডে যে কোষীয় গঠন তৈরি হয় সেটাই পাটিকে শীতল করে। অন্য জায়গার মুর্তায় সেই একই "ঠান্ডা অনুভূতি" আসে না।

গাছ থেকে বেত: সংগ্রহের পুরো প্রক্রিয়া

মুর্তা গাছ লাগানোর পর ২-৩ বছর অপেক্ষা। এই সময়ে গাছ পরিণত হয়, কাণ্ড যথেষ্ট মোটা ও দৃঢ় হয়।

বেত কাটার মৌসুম আশ্বিন-কার্তিক (অক্টোবর-নভেম্বর)। বর্ষার পানি নেমে গেলে, কাণ্ড শুকিয়ে শক্ত হতে শুরু করলে কাটা হয়। খুব তাড়াতাড়ি কাটলে কাণ্ড নরম থাকে, পাটি ভালো হয় না। দেরি করলে কাণ্ড বেশি শুকিয়ে ভঙ্গুর হয়ে যায়।

কাটার পর কাণ্ড থেকে বেত বানানোর ধাপগুলো:

  1. ছিলা - কাণ্ডের বাইরের সবুজ আবরণ ছিলে ফেলা হয়। ভেতরের সাদা-হলুদ অংশটাই কাজের।
  2. চিড় কাটা - কাণ্ডকে লম্বালম্বি চিকন চিকন ফালিতে কাটা হয়। এই ফালিকে বলে "চিড়"। সূক্ষ্ম পাটির জন্য চিড় যত চিকন, পাটি তত মসৃণ। হাতির দাঁতের পাটিতে প্রতিটি চিড় ১ মিলিমিটারের কম চওড়া হতে পারে।
  3. রোদে শুকানো - চিড়গুলো ৩-৫ দিন রোদে শুকানো হয়। এতে আর্দ্রতা কমে, বেত শক্ত ও টেকসই হয়।
  4. রং করা (ঐচ্ছিক) - কারুবাড়ি পাটির জন্য কিছু চিড় রং করা হয়। আগে প্রাকৃতিক রং ব্যবহার হত (হলুদ গাছ, মেহেদি), এখন অনেকে সিন্থেটিক রং ব্যবহার করেন।
  5. বুনন - শুকনো চিড় দিয়ে হাতে বোনা শুরু। একটি সাধারণ ৬x৪ ফুট পাটি বুনতে ৭-১২ দিন লাগে।

কেন শুধু মুর্তাই?

বাংলাদেশে বেতের মাদুর অনেক ধরনের আছে। তালপাটি, বাঁশের চাটাই, হোগলা পাটি। কিন্তু শীতল পাটি বলতে শুধুই মুর্তার পাটি বোঝায়।

কারণটা মুর্তা কাণ্ডের অনন্য কোষীয় গঠন। কাণ্ডের ভেতরে অসংখ্য বায়ুপূর্ণ কোষ থাকে - microscope-এ দেখলে মৌমাছির চাকের মতো। এই কোষগুলো শরীরের তাপ টেনে নিয়ে দ্রুত পরিবেশে ছড়িয়ে দেয়। প্লাস্টিক বা সাধারণ বেতের মাদুরে এই গঠন নেই। তালপাটিতেও নেই। মুর্তার এই বৈশিষ্ট্য অনন্য, এবং এটাই শীতল পাটির নামকরণের কারণ।

মুর্তা গাছের সংকট

সমস্যা আছে। বেশ কয়েকটা।

প্রথমত, জলাভূমি কমছে। সিলেটের হাওর-সংলগ্ন জমিতে ধান চাষ বাড়ছে, বসতি বাড়ছে। মুর্তার প্রাকৃতিক আবাস সংকুচিত হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, নতুন প্রজন্মের অনেকে পাটিয়ালের কাজ ছেড়ে দিচ্ছেন। গার্মেন্টস বা প্রবাসে যাওয়ায় আয় বেশি, পরিশ্রম কম। ফলে মুর্তা বাগান রক্ষণাবেক্ষণ কমছে।

তৃতীয়ত - এবং এটা আমার কাছে সবচেয়ে উদ্বেগজনক - প্লাস্টিকের "শীতল পাটি" বাজারে ঢুকেছে। ৳২০০-৳৪০০ দামে বিক্রি হচ্ছে যেটাকে অনেকে "শীতল পাটি" ভাবছেন। আসল মুর্তার পাটি ৳১,৫০০ থেকে শুরু হয়। দাম দেখে অনেকে প্লাস্টিকেরটাই কিনছেন, আসল পাটির চাহিদা কমছে, কারিগরদের আয় কমছে। চক্র।

মুর্তা গাছ চেনার সহজ উপায়

সিলেট অঞ্চলে গেলে রাস্তার পাশে, জলাভূমির ধারে মুর্তা দেখতে পাবেন। চেনার কয়েকটি উপায়:

  • . কাণ্ড সোজা, সবুজ, বাঁশের চেয়ে অনেক পাতলা (আঙুলের মতো মোটা)
  • . পাতা চওড়া, কলাপাতার মতো কিন্তু ছোট (৩০-৫০ সেমি)
  • . গোড়া সবসময় ভেজা মাটিতে বা পানিতে ডোবা
  • . ঝোপের মতো দলবেঁধে জন্মে, একটি গোড়া থেকে ১০-২০টি কাণ্ড বের হয়
  • . ফুল ছোট, সাদা, গাছের মাথায় ফোটে - তবে ফুল সবসময় থাকে না

শীতল পাটি সম্পর্কে আরও জানতে চান?

মুর্তা গাছ তো জানলেন। এবার জানুন কীভাবে এই গাছের বেত থেকে শীতল পাটি তৈরি হয়, দাম কত, আসল-নকল চেনার উপায় কী, আর কোথায় কিনলে কারিগর সরাসরি উপকৃত হবেন।

এই লেখা সম্পর্কে

লেখক: কারুবাড়ি টিম . তথ্যসূত্র: মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের পাটিয়াল কারিগরদের সাথে কথোপকথন, UNESCO ICH nomination file (2017), Bangladesh National Herbarium records. ভুল তথ্য পেলে hello@karubari.com-তে জানান। শীতল পাটি সম্পর্কে বিস্তারিত: শীতল পাটি গাইড